
খুশকি সমস্যা প্রতিটি মানুষের লাইফে একটি সাধারন সমস্যা। বিশেষত শীতকালে কম বেশি সবাই এই সমস্যার মুখোমুখি হন। যার ফলে অতিরিক্ত চুল পড়ার সমস্যায় ভুগতে হয়। সপ্তাহে ৩-৪ বার শ্যাম্পু করার পরেও এই সমস্যা থেকে রেহাই মেলে না। বড় চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায় এই খুশকি। শুধু তাই নয়, মানসিক স্ট্রেস, অস্বাস্থ্যকর খাবার, দূষণ ইত্যাদি বিভিন্ন কারণেও খুশকি হতে পারে। তাই আপনাদের চিন্তায় একটু লাগাম দিতে হাজির কিছু টোটকা নিয়ে। ঘরে বসেই কিছু পদ্ধতির মাধ্যমে আপনি স্ক্যাল্পে থেকে চিরতরে খুশকি দূর করতে পারেন। আসুন দেখে নিন ঘরোয়া পদ্ধতিতে খুশকি দূর করার উপায় –
![]()
খুশকি কি (What is dandruff)
মেলাসেজিয়া নামক ছত্রাক স্ক্যাল্পে বৃদ্ধি পায়, তখন স্ক্যাল্পে খুশকির প্রবণতা বাড়ে। স্ক্যাল্পে ময়লা জমার ফলে খুশকি সহজে রিমুভ হতে চায় না।
সাধারণত দুই ধরনের খুশকি দেখা যায়। একরকম খুশকি ড্রাই স্ক্যাল্পে জন্য হয়ে থাকে এবং আরেক ধরনের খুশকি অয়েলি স্ক্যাল্পে জন্য হয়ে থাকে।
আরও পড়ুন । চুলের খুশকি প্রকারভেদ, কারণ এবং প্রতিকার

খুশকি কেন হয় (Why is dandruff)
মেলাসেজিয়া এক ধরণের ছত্রাক প্রাণী ও মানুষের ত্বকে পাওয়া যায়। এটি ত্বকে প্রদাহ এবং সংক্রমণ সৃষ্টি করতে পারে যা খুশকির সমস্যা তৈরি করে। দূষণ, হরমোনস, মাথার ত্বকে খুব বেশি তেল বা ইমিউন সিস্টেমের সমস্যার কারণেও খুশকি হতে পারে।
আরও পড়ুন । ঘরে বসে করে নিন প্রাকৃতিক উপায়ে পাকা চুলের চিকিৎসা
খুশকির লক্ষণ (Symptoms of dandruff)
বেশিরভাগ কিশোর এবং প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য, খুশকির লক্ষণগুলি সনাক্ত করা সহজ। খুশকির লক্ষণগুলির মধ্যে রয়েছে চুলের এবং কাঁধে মৃত ত্বকের সাদা ফ্লেকের পাশাপাশি মাথার ত্বকে চুলকানি। খুশকির ফ্লেকগুলি সাধারণত মাথার ত্বকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে।
আরও পড়ুন । ত্বক, চুল ও স্বাস্থ্যের জন্য পেঁয়াজের উপকারিতা

খুশকি দূর করার উপায় (Ways to get rid of dandruff)
অল্প কিছু উপকরণ দিয়ে ঘরোয়া পদ্ধতিতে খুশকি সমস্যা থেকে মুক্তি উপায় খুঁজে পাওয়া যায়। ঘরোয়া পদ্ধতিতে খুশকি দূর করার উপায় গুলি হল –
১. লেবুর রস (Lemon juice)

আমরা সকলেই জেনে থাকি লেবুর রস খুশকি রিমুভ করতে উপকারি। কিন্তু কিছুদিন অ্যাপ্লাই করার পর আবার খুশকি ফিরে আসে। যার দরুন আমরা হাল ছেড়ে দিই। লেবুর রসে সত্যিই খুশকি কমে যায় কিন্তু এটি ব্যবহার করার পদ্ধতি রয়েছে। তাই হাল না ছেড়ে সঠিক পদ্ধতিতে অ্যাপ্লাই করুন আজই।
ব্যবহার করার প্রণালীঃ
একটি অর্ধেক লেবুর রস বের করে চুলের গোড়ায় মেখে ৩০ মিনিট অপেক্ষা করুন। এবার স্নানের সময় জলের মধ্যে একটি লেবুর রস মিশিয়ে নিন। মাথা পরিষ্কার করার সময় এই মিশ্রিত জল দিয়ে স্ক্যাল্প পরিষ্কার করবেন। ১০-১৫ দিন নিয়মিত পদ্ধতিটি অনুকরণ করলে আশা করি, খুশকির সমস্যায় রেহাই পাবেন।
২. নিম ও অলিভ অয়েল (Neem and olive oil)

নিম ত্বকের পাশাপাশি চুলেরও যত্ন নয়। খুশকি দূর করার উপায় এটি অন্যতম উপাদান। নিম, সঙ্গে অলিভ অয়েল স্ক্যাল্পের খুশকি চিরতরে দূর করে।
ব্যবহার করার প্রণালীঃ
পদ্ধতি ১ ৪-৫ টি শুকনো নিম পাতার গুঁড়ো করে ৪ চা চামচ অলিভ অয়েলে মিশিয়ে পেস্ট তৈরি করে নিন। পেস্টটি স্ক্যাল্পে অ্যাপ্লাই করে ১ ঘণ্টা রেখে শ্যাম্পু করে কন্ডিশনার লাগিয়ে নিন।
পদ্ধতি ২ নিমপাতা আধ ঘণ্টা সেদ্ধ করে পেস্ট বানিয়ে নিন। এবার পেস্টটি স্ক্যাল্পে ৩০ মিনিট লাগিয়ে রেখে ধুয়ে ফেলুন।
Key Ponts: নিমপাতায় অ্যান্টি ফাঙ্গাল বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা খুশকির চিকিৎসায় প্রয়োগ করা হয়।
৩. কমলালেবুর খোসা (Orange peel)

খুশকি দূর করার উপায় নিবন্ধটিতে আরও একটি ম্যাজিক টোটকা হল কমলালেবুর খোসা। কমলালেবুর খোসায় অ্যাসিডযুক্ত উপাদান রয়েছে যা স্ক্যাল্পের অতিরিক্ত অয়েল দূর করে পাশাপাশি খুশকির প্রবণতা রোধ করে। বাড়িতে কমলালেবুর খোসার হেয়ার প্যাক বানিয়ে নিতে পারেন।
ব্যবহার করার প্রণালীঃ
কয়েকটি কমলালেবুর খোসা ও ৪-৫ চা চামচ লেবুর রস ব্লেন্ড করে একটি হেয়ার প্যাক বানিয়ে নিন।
প্যাকটি স্ক্যাল্পে লাগিয়ে মিনিট ৩০ বাদে শ্যাম্পু করে নেবেন।
আরও পড়ুন । চুলের যত্নে ৫ টি জবা ফুলের উপকারিতা
৪. দই ও লেবুর রস (Yogurt and lemon juice)

দই চুলের পুষ্টি জোগায় পাশাপাশি খুশকি নির্মূল করতে এটি অপরিহার্য উপাদান।
ব্যবহার করার প্রণালীঃ
১ কাপ দইয়ে অর্ধেক লেবুর রস মিশিয়ে নিন। মিশ্রণটি স্ক্যাল্পে লাগিয়ে রাখুন। ১০ থেকে ১৫ মিনিট রেখে ধুয়ে ফেলুন। শ্যাম্পু করতে ভুলবেন না।
৫. ভিনিগার (Vinegar)

আপেল সাইডার ভিনিগার স্ক্যাল্পে জীবাণু সঙ্গে লড়াই করে এবং খুশকির চিকিৎসায় সহায়তা করে।
ব্যবহার করার প্রণালীঃ
১/২ কাপ আপেল সাইডার ভিনিগার নিয়ে একটি কলা চটকে ভালো করে পেস্ট করে নিন। এবার মিশ্রণটি চুলে প্রয়োগ করুন। পাশাপাশি মাথার ত্বকে মাসাজ করুন কিছুক্ষণ। ১৫-২০ মিনিট রেখে ঠাণ্ডা জলে চুল ধুয়ে নিন।
Key Point: কলায় উপস্থিত ভিটামিন বি, যা চুলের ভরপুরপুষ্টি যোগায় ।
৬. অ্যালোভেরা (Aloe Vera)

অ্যালোভেরার অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল এবং অ্যান্টিফাঙ্গাল বৈশিষ্ট্য রয়েছে। তাই এই উপাদানটি খুশকি দূর করতে সহায়তা করে।
ব্যবহার করার প্রণালীঃ
অ্যালোভেরার পাতা থেকে জেল বের করে স্ক্যাল্পে লাগিয়ে রাখুন। ৩০ মিনিট পর ভালো করে শ্যাম্পু করে নেবেন।
৭. মেথি (Fenugreek)

মেথি শুধু স্বাস্থ্যের জন্য নয়, চুলের যত্নেও কার্যকর। মাথার চামড়ায় খুশকি জমে বা ময়লা জমে, যা দূর করতে পারে মেথি।
ব্যবহার করার প্রণালীঃ
মেথি সারারাত ভিজিয়ে রাখতে হবে। ভিজিয়ে রাখা মেথি পেস্ট করে নিন এবং একটি ডিমের সাদা অংশ মিশিয়ে নিন। এবার মিশ্রণটি চুলে লাগিয়ে ৩০ মিনিট বাদে পরিষ্কার করে নেবেন।
৮. Tea Tree অয়েল (Tea Tree Oil)

চুলের খুশকি দূর করার জন্য ট্রি টি অয়েল অত্যন্ত ভালো। এই অয়েলে অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল গুণ রয়েছে। ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের কারণে সৃষ্ট খুশকিও দূর করতে পারে।
ব্যবহার করার প্রণালীঃ
Tea tree অয়েলের সঙ্গে সামান্য নারকেল তেল মিশিয়ে স্ক্যাল্পে হালকাভাবে মাসাজ করুন। ১০-১৫ মিনিট বাদে শ্যাম্পু করে নিন।
৯. বেকিং সোডা (Baking soda)

খুশকির হাত থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য বেকিং সোডা একটি চমৎকার ঘরোয়া টোটকা। তাই খুশকির হাত থেকে রেহাই পেতে বেকিং সোডা ট্রাই করেই দেখতে পারেন।
ব্যবহার করার প্রণালীঃ
চুল ভিজিয়ে বেকিং সোডা নিয়ে স্ক্যাল্পে ঘষুন বা মাসাজ করে নিন। মিনিট দুয়েক রেখে শ্যাম্পু করে নেবেন।
১০। পেঁয়াজের রস (Onion juice)

খুশকির সমস্যায় ভোগেন। তারা খুশকি দূর করার উপায় হিসাবে পেঁয়াজ ব্যবহার করে দেখতে পারেন। কারণ এটি খুশকি সৃষ্টিকারী ব্যাকটিরিয়াকে মেরে ফেলে।
ব্যবহার করার প্রণালীঃ
তিন চা চামচ মেথি বীজ এক রাত ভিজিয়ে রেখে ঘন পেস্ট করে নিন এবার এতে পেঁয়াজের রস মিশিয়ে চুলে লাগান। ৩০ মিনিট পর শ্যাম্পু করে নেবেন।
আরও পড়ুন । চুলের যত্নে ভিনিগার: চুলের যত্নে আপেল সাইডার ভিনিগার
১১। পেয়ারা পাতা (Guava leaves)

পেয়ারা পাতার মধ্যে থাকে প্রচুর পরিমানে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ট্যানিন যা চুলে থাকা নানান ব্যাকটেরিয়া থেকে রক্ষা করে। শুধু তাই নয়, এই পাতা স্বাস্থ্যের জন্যও অনেক উপকারী। পেয়ারা পাতা সিদ্ধ করে খেলে পেটের সমস্যা থেকেও রেহাই পাওয়া যায়।
ব্যবহার করার প্রণালীঃ
পেয়ারা পাতাকে বেঁটে ১০ মিনিটের জন্য স্ক্যাল্পে লাগিয়ে রাখতে হবে। এরপর ভালো করে শ্যাম্পু করে নিতে হবে। এছাড়াও কয়েকটি পেয়ারা পাতাকে ২০ মিনিট মত জলে ফুটিয়ে নিন। তারপর সেই জল ছেঁকে নিয়ে ঠাণ্ডা করে নিতে হবে। স্নানের শেষে সেই জল দিয়ে চুল ধুয়ে ফেলতে হবে।

খুশকি দূর করার উপায় নিবন্ধে থাকল অতিরিক্ত টোটকা –
- নিয়মিত স্ক্যাল্প পরিষ্কার রাখুন।
- রোদে অনেকক্ষণ ধরে চুল খুলে রাখবেন না।
- নিয়মিত চুল আঁচড়ান।
- রসুন ও পেঁয়াজের রস খুশকি প্রতিরোধ করে।
- কেমিক্যালযুক্ত প্রোডাক্ট এড়িয়ে চলুন।
- চুল অয়েলি হতে দেবেন না।
- সপ্তাহে ২ – ৩ বার শ্যাম্পু করবেন।
- শরীরে জলের অভাব হলে মাথার ত্বক অর্থাৎ স্ক্যাল্পও শুষ্ক হয়ে যায়। তাই স্ক্যাল্পের যত্ন নিতে পর্যাপ্ত পরিমাণে জল খেতে হবে।
- অত্যাধিক ফাস্ট ফুড কিংবা অন্যান্য ফ্যাটজাতীয় খাবার না খাওয়া।
- অতিরিক্ত স্ট্রেসও খুশকির অন্যতম কারণ। তাই স্ট্রেস কমাতে নিয়মিত ব্যায়াম, শারীরিক কার্যকলাপ এবং মেডিটেশনের সাথে নিজেকে নিযুক্ত করুন।
- হেয়ার স্প্রে, জেল অথবা চুলে ব্যবহৃত অন্যান্য স্টাইলিং কিটগুলি খুশকির কারণ হতে পারে। তাই এগুলি ব্যবহার না করাই ভালো।
সচরাচর জিজ্ঞাস্য প্রশ্ন উত্তরঃ
Q. চুলে খুশকি কেন হয়?
A. মেলাসেজিয়া এক ধরণের ছত্রাকের কারণে চুলে খুশকি হয় আবার দূষণ, স্ক্যাল্প অতিরিক্ত তৈলাক্ত অথবা ড্রাই হয়ে গেলেও খুশকি হয়।
Q. লেবুর রসে কি চুলে খুশকি দূর হয়?
A. হ্যাঁ, তবে সঠিক পদ্ধতিতে ব্যবহার করতে হবে।
Q. প্রাকৃতিক উপায়ে কি খুশকি পুরোপুরি দূর হয়?
A. প্রাকৃতিক উপায়ে খুশকি দূর হয় তবে অনেক সময় ধরে নিয়ম করে প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করতে হবে এবং ধৈর্য ধরতে হবে।

